এত সতর্কীকরণের পরও সাতক্ষীরায় বৃদ্ধি পেয়েছে ধুমপায়ীর সংখ্যা

0
136

বিশেষ প্রতিনিধি :
সাতক্ষীরা জেলার ৭ উপজেলার ৭৮ ইউনিয়নে সর্বত্রে এক যুগ পূর্বের তুলনায় বর্তমানে ধুমপানকারীর সংখ্যা অনেকগুণ বেড়ে গেছে। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা সরকারী বেসরকারী অফিস আদালতের কর্মকর্তা কর্মচারীরা প্রকাশ্যে ধুমপান করছে। এছাড়া প্রশাসনের লোক যেমন, পুলিশ বিজিবিরা ও ধুমপান করছে।
বর্তমান সিগারেট ও বিড়ির খোলার গায়ে কোম্পানীরা ধুমপানের কারণে যে যোগ হয় তা ছবিসহকারে সতর্ক বানী প্রচার অব্যহত রেখেছে। এর ফলে ধুমপানকারীর সংখ্যা কমার কথা। কিন্তু কমা তো দূরের কথা, আরও বেড়ে গেছে বলে মনে করেন সুশিল সমাজের মানুষেরা। শিক্ষিত চাকুরীজীবী লোকেরা যখন প্রকাশ্যে ধুমপান করে, তখন অশিক্ষিত লোকেরা আর বসে থাকে না। ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এ ধরনের সতর্কবাণী বিড়ি ও সিগারেট এর গায়ে লেখা থাকা সত্বেও তবু কেন ধূমপান? ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি এর পেছনের কারণ ও উৎস সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন। বয়সগত একটা কারণও এর পিছনে কাজ করে। তবে বন্ধুদের আড্ডায় মেতে ও প্রেমে ব্যর্থতার কারণে ধূমপানের প্রবণতা সমস্ত কারণের মধ্যে অন্যতম।
আমাদের দেশে ধূমপান নিষিদ্ধ আইন আছে; কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই। এর পেছনে একটি কারণ বিরাজ করছে। সেটি হলো যারা এ আইন বাস্তবায়ন করবে তারা অধিকাংশ ধূমপানে অভ্যস্থ। শুধু ছেলেরাই নয়, মেয়েরাও আসক্ত হচ্ছে ধূমপানে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন মেয়ের মধ্যে এই বদ অভ্যাসটি লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত তারা এটাকে ফ্যাশন হিসেবে ধরে নেয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মহিলা পুরুষই চুরুট, বিড়ি, সিগারেট গুল, ইতাদি নেশায় অভ্যস্থ থাকে। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে বিড়ি ও গুলের নেশা বেশী দেখা যায়। বাবা ধূমপানে অভ্যস্ত তাই তাদের সন্তানরাও অতি অল্প বয়সেই ধূমপানের প্রতি নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, মানুষ সর্বাধিক পরিমাণ তামাক সেবন করে থাকে ধূমপানের মাধ্যমে।
তামাকের জন্মভূমি ভার্জিনিয়া, মধ্য আমেরিকা, ব্রাজিল, কিউবা ও ক্যারিবিয়ান দেশ সমূহ। ১৪৯৮ সালে স্পেনের রাণী ইসাবেলার পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করেন তখন তিনি ও তার সঙ্গীরা রেড ইন্ডিয়ানদের ধূমপান করতে দেখেন। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মাধ্যমে ইউরোপীয়দের ধূমপানের সাথে পরিচিতি ঘটে। কলম্বাস ও তার সহযোগীরা তামাক চারা ইউরোপে আনেন। পর্তুগালে রাজধানী লিসবনস্থ ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ নিকোট তামাক পাতায় ঔষধি গুণাবলী আছে ভেবে ফরাসী দেশে তামাকের বিস্তার ঘটান এবং পরবর্তীকালে তারই নামানুসারে তামাক ফরাসি দেশে তামাকের বিস্তার ঘটান এবং পরবর্তীকালে তারই নামানুসারে তামাক গাছের নামকরণ হয়: নিকোটিনিয়াম তাবাকাম।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় প্রথম ব্রিটিশ উপনিবেশক স্থাপক এবং রাণী প্রথম এলিজাবেথের প্রিয় পাত্র, লেখক ও নাবিক স্যার ওয়াল্টার রেলি (১৫৫৪-১৬১৮) ব্রিটেনবাসীকে ধূমপানের সাথে পরিচিত করান। তার লেখনী ও বক্তব্যের কারণে ধূমপান সামাজিক মর্যাদা সম্পন্ন অভ্যাসরূপে সামাজের অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে দ্রুত ব্যপ্তি লাভ করে। এভাবেই বিভিন্ন ঘটনা পরস্পরায় ধূমপান সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত তামাকের উৎপাদন আমেরিকা ইউরোপ ও তরস্কেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্পেনিশ ও ব্যবসায়ীরা আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ধূমপানের খবর আনলেও তখন এ সকল দেশে তামাক উৎপাদন হতো না। আমাদের এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ উপনিবেশের আগে চুরুট বা গাঁজা জাতীয় ধূমপানের কথা জানা যায়। ব্রিটিশ উপনিবেশ বিস্তারের সাথে আফ্রিকা ও এশিয়ার পরাধীন দেশ সমূহে ক্রমান্বয়ে কিছু কিছু করে তামাক পাতার উৎপাদন শরু হয়।
তামাকের ধোঁয়ায় প্রায় চার হাজার রাসায়নিক উপাদানের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা মানব দেহের ক্ষতিকর। এর মধ্যে দু’টি উপাদান সম্পর্কে কিছু তথ্য এখানে উল্লেখ করা হলো ঃ ১৮২৮ সালে তামাকে নিকোটিন নামক ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থের সন্ধান পাওয়া যায়। দু’টি সিগারেটে যে পরিমাণ নিকোটিন থাকে তা যদি একজন মানুষকে ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো হয় তা হলে তার মৃত্যু ঘটাতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন সিগারেট সেবনের পরও মানুষের মুত্যৃ না হওয়ার পেছনে কারণ হচ্ছে নিকোটিনটুকু সে ইনজেকশানের মাধ্যমে গ্রহণ করেনা। ধূমপানের ফলে খুব অল্প পরিমাণ নিকোটিন শরীরে প্রবেশ করে। পরিমাণে অল্প হওয়ায় এর ক্ষতিকর প্রভাবও খুব ধীর গতিতে প্রতিফলিত হতে থাকে এবং তা সহজে অনুভব করা যায় না। মানব দেহের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের ওপরই এই নিকোটিনের প্রভাব সর্বগ্রাসী। একটা সিগারেটের ধোঁয়ায় কার্বন-মন-অক্সাইড গ্রাস থাকে ৫%। এটি একটি বিষাক্ত গ্যাস। ধূমপানের ফলে এই গ্যাস শ্বাস নালীল মাধ্যমে সরাসরি ফুফুসের কুঠুরীর মধ্য দিয়ে রক্তের হিমোগ্লোবিনের সংস্পর্শে আসে। সেখানে অক্সিজেন প্রতিস্থাপন করে রক্তের মধ্যে অক্সিজেন কমিয়ে দেয়। ফলে দেহের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেনের সরবরাহ হ্রাস পায়। এর ফলে দেখা দেয় শ্বাস কষ্ট। বিশেষ করে হৃৎপিন্ডে, মস্তিস্কে এবং ফুসফুসে এর প্রভাব পড়ে ব্যাপকভাবে। ধূমপান কী সত্যিই টেনশন বা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে? এর উত্তর একটাই-না। ধূমপান করার ফলে ধূমপায়ীর দেহে প্রবেশ করে নিকোটিন নামক এক প্রকার নীরব বিষ। এই নিকোটিন মানুষের বায়ু শক্তি দূর্বল করে দেয়। তখন তার সুস্থ এবং স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি হ্রাস পায়। সম্ভবতঃ একজন ধূমপায়ী এ কারণেই ধূমপানকে টেনশনমুক্ত হওয়ার উপকরণ হিসাবে ধরে নেয়।
তবে দেশে ধূমপান বিরোধী আইন পাশ আছে। কিন্তু বাস্তবায়নে রয়েছে দুর্বল পদক্ষেপ। চলার পথে, ভ্যান-রিক্সারয়, বাস, ট্রেনসহ বিভিন্ন স্থানে ধূমপান করতে দেখা যায়। বিশেষ সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলায় পূর্বের তুলনায় বর্তমানে ধূমপায়ীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ধূমপায়ীর শতকরা হার ৭০% থেকে ৮০%। জন সম্মুখে যাতে একজন ধূমপায়ী ধূমপান করতে না পারে তার জন্য সরকারের জোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক সমাজের মানুষেরা।
সুশীল সমাজের মানুষের অভিমত সর্বপ্রথমে সরকারী বেসরকারী প্রশাসনের লোককে ধুমপান বন্ধ করতে হবে। কারণ আইনের লোক যদি বে আইনের কাজ করে তাহলে সাধারণ মানুষ কি আইন মানবে? এ প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। আইনের লোক আগে নিজে আইন মানতে হবে তারপর সকলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে।

রফিকুল ইসলাম/একে/আই।

LEAVE A REPLY