এক আলোকিত মানবিক এ এস পি মেরিনা আক্তার

225
16255

জাহিদ হোসাইনঃ

সাতক্ষীরার একাধিক স্থানীয়, জাতীয় ও অনলাইন পত্রিকায় লক্ষ করলাম, সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মেরিনা আক্তার সদরের শিবপুর ইউনিয়নের শিয়ালডাঙ্গা গ্রামে জানু পারভীনের বাড়িতে। যে জানু পারভীনকে তার ছেলেরা পায়ে লোহার শিকল দিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছিল। অত্যন্ত মানবিক ও হৃদয় বিদারক ঘটনাটি জানতে পেরেই তিনি ছুটে গেছেন তার বাড়ি। তাকে সার্বিকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করার আশ্বাস প্রদান করেছেন। এমনকি, বৃদ্ধ বয়সের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জানু পারভীনের ছেলের বউকে ডেকে  তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার ছেলে দুটোকে ডাকো, তাদের বলে যাই, তুমি বৃদ্ধ হলে তারাও যেন তোমাকে এমন ভাবে লোহার শিকলে বেঁধে রাখে।’ আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয়েছে, এমন মানবিক কথাগুলো একমাত্র সেই বলতে পারে, যার আকাশের মতো উদার একটা সুন্দর মন আছে, যিনি মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়া মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝেন, মানবিক বিপর্যয় দেখলে যার মন কেঁদে ওঠে। আমি দেখেছি, শুধু জানু পারভীন নয়, ২২ জানুয়ারি ২০১৭ সাতক্ষীরা সদর সার্কেলে যোগদানের পর থেকে যেখানে মানবিক বিপর্যয় লক্ষ করেছেন, সেখানেই তিনি ছুটে গেছেন, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদেরকে সান্তনা দিয়েছেন, মানবিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে তাদের সাহায্য করেছেন। এ এসপি (সদর সার্কেল) মেরিনা আক্তারের সাথে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ আমার হয়নি। তবে মোবাইলে কথা হয়েছে একাধিক বার । কথা বলে মনে হয়েছে তিনি অনেক আন্তরিক একজন মানুষ। তার সম্পর্কে আমি যতদূর জেনেছি, মাস তিনেক আগে তিনি গিয়েছিলেন শিবপুরের সোনাড়ডাঙ্গা গ্রামের রঞ্জন সরকারের ছেলে সুশান্তের বাড়িতে । যে সুশান্তকে মেরে মৃতভেবে বস্তাবন্দি অবস্থায় রাতের আঁধারে রাখালতলা মাঠে ফেলে রেখে গিয়েছিল দূর্বৃত্তরা। যেখানে সরকারদলীয় একজন দালাল ও স্থানীয় একজন মেম্বর অপরাধীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিষয়টিকে ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বিষয়টি ৭ দিন পর গোপনে জানতে পেরে মেরিনা আক্তার চলে যান তার বাড়ি। সান্তনা দিয়ে, সাহস দিয়ে, পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে নিজের খরচে তাকে থানায় আনেন এবং  অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সাহায্য করেন। ২৯ মার্চ ৪র্থ শ্রেণির এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা জানার পরপরই তিনি ছুটে গিয়েছিলেন সদরের ফিংড়িতে ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রীর  বাড়িতে। তাকেও সান্তনা দিয়ে, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা করেছেন।  Satkhira16 copy

২এপ্রিল ‘জীবনের মুল্য মাত্র ৮০ হাজার টাকা’ শিরোনামে সাতক্ষীরা সদরের আবাদের হাটের একটি সংবাদ করে সেটি ফেসবুকে শেয়ার করেছিলাম। সংবাদটি দেখেই ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করেন এবং  নিজের মোবাইল নাম্বার দিয়েছিলেন এর পর তিনি সাথে সাথে পদক্ষেপও নিয়েছিলেন। তখন থেকেই আমি তার মোবাইল নাম্বারটি সংগ্রহে রেখেছি।

সাতক্ষীরা সদর সার্কেলে যোগদানের পর তিনি সার্বিক আপডেট সকলকে জানানোর জন্য নিজে সাতক্ষীরা সদর সার্কেল নামে একটি ফেসবুক একাউন্ট খোলেন। যেখানে প্রতিনিয়ত সাতক্ষীরায় ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো আপডেট দেন এছাড়া তিনি সাতক্ষীরার ডিস চ্যানেলে নিজের মোবাইল নাম্বার দিয়ে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তার সাথে পরামর্শের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। যাতে সবাই তার নাম্বারটি মনে রাখতে পারে আর প্রয়োজনে মোবাইল করতে পারে। যেটি প্রতিনিয়ত সম্প্রচারও হচ্ছে।   Satkhira16 copy

আমি প্রত্যক্ষ করেছি, সাতক্ষীরা শহর বাসী যখন গভীর নিদ্রায় শায়িত, তখনও তিনি নিশাচর প্রাণীর মতো জেগে থাকছেন, রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছেন। সাতক্ষীরা শহর বাসীর সেবা ও নিরাপত্তার যে পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে তিনি এসেছেন তা যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করছেন। আমি অবাক হয়ে যায়, যে কাজগুলো করতে একজন পুরুষকে হিমশিম খেতে হয়! একজন নারী হয়ে তিনি ২৪ ঘন্টা সাবলীলভাবে সেই কাজগুলো করে চলেছেন।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে হয় ‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।’ পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বার্থে সাতক্ষীরা সদর সার্কেলের মানুষকে ছেড়ে, সাতক্ষীরা হতে মেরিনা আক্তারও একদিন চলে যাবেন, যেখানে যাবেন, যাদের কাছে যাবেন, নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তারা অনেক ভাগ্যবান । মেরিনা আক্তার যেখানেই যাক, যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক। সাতক্ষীরা বাসীর দোয়া সর্বসময় তার সাথে থাকবে। আল্লাহ তার মঙ্গল করবেন। এছাড়া, সাতক্ষীরা বাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবেন, মেরিনা আক্তারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে সাতক্ষীরায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) হয়ে যিনি আসবেন, তিনি মেরিনা আক্তারের মতো সাতক্ষীরা বাসীর হৃদয়ে জমে থাকা দুঃখ কষ্ট অনুধাবন করবেন এবং মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় মেরিনা আক্তারকে ছাড়িয়ে যাবেন এবং মেরিনা আক্তারের দেখানো পথগুলো থেকে নিজেদেরকেও আলোকিত করবেন।

লেখক সাংবাদিক

225 COMMENTS