ঈদের বাকা চাঁদ সামাজিক মেলবন্ধনের প্রতীক হয়ে আসুক

0
57

বরুণ ব্যানার্জী:

১৮ রোজা হতে আষাঢ় মাস শুরু, অর্থাৎ বর্ষাকাল। কিন্তু চৈত্রের প্রথম সপ্তাহ হতে যে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছিল তা এখনো পর্যন্ত অব্যাহত আছে। তবে মাঝে মাঝে গ্রীষ্মের কষ্ট দেশবাসীকে পোহাতে হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বর্ষার চাপ ও জলাবদ্ধতায় জনগণকে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হয়। এদিকে বঙ্গোপসাগরে নিম্ন চাপের সৃষ্টি হলে গত কয়েক দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ধসের ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সেনাসহ শতাধিক মানুষ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। রোজার ও ঈদের মাসে বাংলাদেশের বাজারে আগুন লাগে যতই বর্ষাকাল হোক। এই আগুন কিসের তা সবাই জানেন। যেমন-চিনির মিষ্টি ও চালের বাজারে আগুন, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেঁয়াজ, লবণ, খেজুর, ডাল, বেগুন, আদা, আটা, ময়দা, মাংস ও নিত্যপণ্য দ্রব্যের মূল্য। যেসব এলাকায় রমজান মাসে ছেলে বা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ইফতারি এবং জ্যৈষ্ঠ মাসে আম-কাঁঠাল দেওয়ার প্রচলন আছে, তারা যদিও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে একত্রে দুটোই দিচ্ছেন, তারপরও তাদের জন্য সব কিছু বিষফোঁড়ার মতো মনে হচ্ছে। যে ব্যক্তির আয়ের ওপর সবকিছু নির্ভর এবং যে ব্যক্তি বাজারের স্লিপ নিয়ে বাজার করেন, তিনিই বোঝেন কত ধানে কত চাল। সবকিছু ছাপিয়ে রমজান শেষে সন্ধ্যাকাশে ঈদের বাকা চাঁদ দেখামাত্রই মুসলমানরা ঈদের আগমনবার্তায় উল্লসিত হয়ে ওঠেন। কবি নজরুলের দারুণ শ্রুতি সুখকর ঈদের গানটি সব ধরনের প্রচার মাধ্যমে বেজে ওঠে বলে দেয় ঈদের আগমনী বার্তা। গানের অপূর্ব মূর্ছনায় সবাই বিমোহিত হয়ে ভুলে যান বিগত ৩০ দিনের অসহনীয় কষ্টের কথা। মূলত এই শ্রুতিমধুর গানটির মধ্যে একটি সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কারণ, গানটির বিরাট অংশজুড়ে ইসলামের শাশ্বত সৌন্দর্য ও জাকাতভিত্তিক অর্থনীতির স্বপক্ষে বলিষ্ঠ বক্তব্য লক্ষণীয়ভাবে ফুটে উঠেছে। এক মাস সিয়াম সাধনার পর বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পালন করবে ঈদ। ঈদ কেবল সিয়াম সাধনার ফলই নয়, বিশ্বমানবতার এক মহামিলন মেলা। ত্যাগ, সহনশীলতা, বিনয় আত্মসংযম ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার এক মহান শিক্ষা পবিত্র মাহে রমজান ও ঈদ পালনের মধ্যে। বাংলাদেশে ঈদ কেবল মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব নয়, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এটা এখন সর্বজনীন মিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এটি বাঙালি সংস্কৃতিরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ঈদ ধনী গরিবের মধ্যকার ব্যবধান ভুলিয়ে দিয়ে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়। সাম্য ও সৌহার্দ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক হচ্ছে এই ঈদ। ঈদ রচনা করে পারিবারিক ও সামাজিক আত্মীয়তার মেলবন্ধন। ঈদের শাব্দিক অর্থ আনন্দ হলেও আমাদের সমাজে ঈদ মানে হচ্ছে এক নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা, কার কত অর্থের দাপট আছে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা। এ প্রতিযোগিতায় যারা জয়ী হয়, ঈদের বাকা চাঁদ তাদের জন্য আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। আর যারা হেরে যায়, তাদের কাছে ঈদের বাঁকা চাঁদকে নিছক গলাকাটা ছুরি বলে ভ্রম হয়। তবু বলতে হয়, ঈদুল ফিতর প্রত্যেকের জীবনে মঙ্গলময় বার্তা নিয়ে আসুক। অতীতের গ্লানি ও হতাশা ঝেড়ে ফেলে সাবাই সুখ ও সমৃদ্ধময় জীবনে পা বাড়াক। ঈদ সবার জন্য আনন্দের ঝরনাধারা বয়ে আনুক, প্রতিটি মানুষের মুখে ফুটে উঠুক আনন্দের হাসি। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

LEAVE A REPLY