‘ইফরাদ’ হজ আদায় করবেন যেভাবে

52
244

অনলাইন ডেস্ক:

মুসলিম উম্মাহর হজ পালন আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত সুস্পষ্ট বিধান। যারা সামথ্যবান তারাই হজ পালন করবেন। ইফরাদ, কিরান ও তামাত্তু- এ তিনভাবে হজ পালনে নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। সব হজ পালনের নিয়ম ও করণীয় এক রকম নয়। ইফরাদ হজ আদায়ের নিয়তকারী ব্যক্তি শুধুমাত্র হজ পালন করবে; সে কোনো ওমরা পালন করবে না। ইফরাদ হজ আদায়কারীর জন্য তার করণীয় তুলে ধরা হলো-

ইফরাদ হজ
হজের মাসে (শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ) শুধুমাত্র হজ আদায়ই হলো ইফরাদ হজ। এ হজের সফরে ওমরা পালন করা যাবে না। এ ধরনের হজ আদায়কারীকে ‘মুফরিদ’ বলা হয়। বিশেষ করে যারা অন্যের হজ অর্থাৎ বদলি হজ আদায় করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁরাই ইফরাদ হজ আদায় করেন।

ইফরাদ হজ আদায়ে করণীয়
ইফরাদ, কিরান ও তামাত্তু- এ তিন প্রকারের হজের জন্য ফরজগুলো সব এক। এখানে ধারাবাহিকভাবে ইফরাদ হজের নিয়ম তুলে ধরা হলো-

>> হজের নিয়তে ইহরাম বাঁধা (ফরজ)
যারা সরাসরি মক্কায় যাওয়ার ইচ্ছা করবে, তাদের জন্য প্রথম করণীয় হলো নিজ নিজ দেশ বা ঘর থেকেই যথাযথ নিয়ম পালনের মাধ্যমেই ইহরাম বাঁধা

মনে রাখতে হবে
ইফরাদ হজ আদায়কারীরা যেখান থেকে হজের ইহরাম বাঁধবেন; তখন থেকে শুরু করে হজের সব কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকতে হবে।

>> তাওয়াফে কুদুম (সুন্নাত)
বাইতুল্লায় প্রবেশ করে যে তাওয়াফ করা হয় তাই তাওয়াফে কুদুম। যেমনিভাবে মসজিদে প্রবেশ করে মুসলিম উম্মাহ দুখুলিল মসজিদ আদায় করেন। আর ইফরাদ ও ক্বিরান হজ আদায়কারীদের জন্য এ তাওয়াফ (তাওয়াফে কুদুম) করতে হয়। তাওয়াফে কুদুমে ইজতিবা ও রমল করতে হয়।

আরও পড়ুন- কাবা শরিফ তাওয়াফে ‘ইজতিবা ও রমল’ করার রহস্য

>> সাঈ (ওয়াজিব)
হজে ইফরাদসহ সব হজ পালনকারীদের জন্য সাঈ করা আবশ্যক (ওয়াজিব)। তাওয়াফে কুদুমের সময় ‘সাঈ’ করা সম্ভব না হলে তাওয়াফে জিয়ারাতের পর এ ‘সাঈ’ আদায় করতে হবে।সাফা পাহাড়ের ওপরে আরোহন করে সেখান থেকে ক্বিবলামুখী হয়ে সাঈ’র নিয়ত করে সাফা হতে সাঈ শুরু করা। সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী নির্ধারিত চিহ্নিত স্থান দ্রুতবেগে অতিক্রম করা।মারাওয়া পাহাড়ে আরোহন পূর্বক দোয়া করা। অতঃপর আবার সাফায় আসা। এভাবে সাতবার সাঈ করা। যদি এ সময় সাঈ না করা যায়; তবে তাওয়াফে জিয়ারাতের পর তা আদায় করা ওয়াজিব।

হজের পরিপূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ
পবিত্র নগরী মক্কা মসজিদে হারাম থেকে ৭ জিলহজ হজ সম্পর্কিত খোতবা শুনে অনেকেই ওই দিনই মিনার উদ্দেশ্যে রহওয়ানা হয়। তবে তবে জিলহজের ৮ তারিখ জোহরের নামাজের আগে মিনায় উপস্থিত হওয়া উত্তম।

>> মিনায় রাত যাপন (সুন্নাত)
মিনায় রাত যাপন করা (সুন্নাত)। আর জিলহজের ৮ তারিখ জোহর থেকে ৯ তারিখ ফজর পর্যন্ত ৫ ওয়াক্ত (জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজর) নামাজ মিনায় পড়া (মুস্তাহাব)।

>> আরাফাতের ময়দানে অবস্থান (ফরজ)
হজের অন্যতম রুকন হলো আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। হাদিসে আরাফায় উপস্থিত হওয়াকেই হজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন- আরাফায় অবস্থান বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যের প্রতীক জিলহজের ৯ তারিখ সূর্যোদয়ের পর সম্ভব হলে গোসল করে মিনা থেকে একবার তাকবিরে তাশরিক পাঠ করে আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশ্যে রহওয়ানা হওয়া। জোহরের নামাজের পূর্বেই আরাফায় উপস্থিত হওয়া উত্তম।

আরও পড়ুন- ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত আরাফাত ময়দান ওঠা-বসায়, আসা-যাওয়ায় সব সময় তালবিয়া পাঠ করা – ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক; লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক; ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক; লা শারিকা লাক’। অতপর দুপুরের পর থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে হজের খুতবা শ্রবন করা। এবং নিজ নিজ তাবুতে জোহর ও আসরের নামাজ নির্দিষ্ট সময়ে আলাদাভাবে আদায় করা। সেখান থেকে সুর্যাস্তের পর মাগরিবের নামাজ না পড়ে মুযদালিফার দিকে রওয়ানা হওয়া।

>> মুজদালিফায় অবস্থান (ওয়াজিব)
আরাফাতের ময়দান থেকে সূর্যাস্তের পর মুজদালিফায় গিয়ে ইশার সময় মাগরিব ও ইশা এক আজানে ও একই ইক্বামাতে একসঙ্গে আদায় করা (সুন্নাত)।

আরও পড়ুন- জেনে নিন আরাফা মিনা ও মুযদালিফার সীমানা মুজদালিফায় রাতে অবস্থান করা সুন্নাত। আর ফজরের নামাজের পর থেকে সুর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ে অবস্থান করা ওয়াজিব। যদি কেউ ফজরের নামাজের আগে মুজদালিফা ত্যাগ করে তার জন্য দম (কুরবানি) ওয়াজিব।তাই তাড়াহুড়ো না করে মুজদালিফায় ফজরের নামাজ আদায় করে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া। তাড়াহুড়ো করে হজের কোনা ফরজয়িত বা ওয়াজিব যেন তরক না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।প্রত্যেক নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক আদায় করা অর্থাৎ ১৩ জিলহজ আসর নামাজ পর্যন্ত তাকবিরে তাশরিক আদায় করা।

কংকর সংগ্রহ
মুজদালিফা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে রহওয়ানা হওয়ার সময় পথিমধ্যে কোথাও থেকে পাথর সংগ্রহ করে নিতে হবে।

>> কংকর নিক্ষেপ (প্রথম দিন)
১০ জিলহজ ফজর নামাজ মুজদালিফায় আদায় করে সুর্যোদয়ের পূর্বেই মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া। মিনায় এসে ওই দিন দ্বি-প্রহর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে শুধুমাত্র ‘জামারাতে আকাবা’ বড় জামরায় যথাযথ নিয়মে ৭টি (সাত) কংকর নিক্ষেপ করা (ওয়াজিব)।

>> মাথা মুণ্ডন করা (ওয়াজিব)
ইফরাদ হজ পালনকারীদের জন্য কুরবানি করতে হয় না। তাই কংকর নিক্ষেপের পর মাথা হলক বা মুণ্ডনের মাধ্যমে বিশ্ব নবির আদর্শের অনুসরণ করা (ওয়াজিব)।হলক বা মাথা মুণ্ডনের মাধ্যমে ‘স্ত্রী সহবাস’ ছাড়া সব কাজ করা যাবে।

>> তাওয়াফে জিয়ারাত (ফরজ)
হজের সর্বশেষ ফরজ কাজ হলো তাওয়াফে জিয়ারত। এ তাওয়াফে জিয়ারাত ১২ জিলহজ সুর্যাস্তের আগেই সম্পন্ন করতে হবে। ১২ তারিখ সুর্যাস্তের আগে এ তাওয়াফ করতে না পারলে, দম বা কুরবানি দিতে হবে।

>> সাঈ (ওয়াজিব)
তাওয়াফে কুদুমের পর সাফা-মারওয়া সাঈ না করলে, তাওয়াফে জিয়ারাতের সময় সাফা-মারওয়ায় সাঈ আদায় করে নিতে হবে।

>> কংকর নিক্ষেপ (ওয়াজিব)
১১ ও ১২ জিলহজ উভয় দিনই মিনায় অবস্থিত তিন জামরায় ৭টি করে ২১টি পাথর নিক্ষেপ করা (ওয়াজিব)। প্রথমে ছোট জামরায়, তারপর মধ্যম, অতপর বড় জামরায় কংকর নিক্ষেপ করা। সর্বক্ষেত্রে দুর্বল ও নারীদের জন্য রাতের বেলায় কংকর নিক্ষেপ করা উত্তম।

>> বিদায়ী তাওয়াফ (ওয়াজিব)
সমগ্র বিশ্ব থেকে আগত সব হজ যাত্রীদের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ করা ওয়াজিব। তবে হজ শেষে বাইতুল্লায় যে কোনো নফল তাওয়াফই বিদায়ী তাওয়াফে পরিণত হয়ে যায়।

বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়-
যারা বদলি হজ আদায় করেন। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির হয়ে হজ আদায় করেন, তিনি ইফরাদ হজ করবেন।আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সব ইফরাদ হজ আদায়কারীকে যথাযথ নিয়মে এ হজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের হৃদয়ে হজের রুহানিয়াত, নুর ও নুরানিয়াত এবং ইশক ও মুহাব্বাত দান করুন। আমিন।

গাজী ফারহাদ

52 COMMENTS