আদালত-অ্যাটর্নি জেনারেল বিতণ্ডা

0
144

অনলাইন ডেস্ক:

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে অর্পণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল শুনানিতে দুই বিচারপতি না থাকা ও সময় আবেদন মঞ্জুর না করায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের বাগবিতণ্ডা হয়েছে।

শুনানির একপর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতের প্রতি অনাস্থা ও মামলা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা বলেন।   প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বেঞ্চের অপর চার বিচারপতি হলেন, বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।  আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।  প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের বিষয়টি জাতীয় সংসদের হাতে নাকি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে থাকা উচিত তা নির্ধারণ হওয়া দরকার।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপনি তো আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত আছেন।প্রধান বিচারপতি বলেন, এ মামলার সঙ্গে বিচারকদের শৃঙ্খলার বিষয়টি জড়িত। এ ক্ষেত্রে কোনো শূন্যতা থাকতে পারে না।এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপিল বিভাগে এখন বিচারপতির সংখ্যা সাতজন। কিন্তু শুনছেন পাঁচজন। এভাবে বিচার চললে আমি অনাস্থা দিতে বাধ্য হবো। তিনি বলেন, আপনারা বলেছেন যে সবাই শুনবেন। আজ তা শুনছেন না। সাতজনকে শুনতে বলায় ভুল কোথায়?প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি আদালতকে খাটো করে (আন্ডার মাইন্ড) দেখছেন।অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তা করছি না। আমাদের আবেদন, হাইকোর্টের রায়ে সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে কিছু মন্তব্য করা হয়েছে।প্রধান বিচারপতি বলেন, বৈরী কিছু থাকলে সেটা আমরা দেখব।অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রায়ে অনেক কথা আছে।বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিয়া বলেন, এখনো তো মামলা শুনলামই না।প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি (অ্যাটর্নি জেনারেল) শুনানি বিলম্ব করছেন।অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমাদের আরেকটি আবেদন আছে। পৃথিবীর কোনো দেশেই বিচার বিভাগ (হাইকোর্টের রায় প্রসঙ্গে) এভাবে কথা বলতে পারে না। আমি অসহায়। এভাবে শুনানি অব্যাহত রাখলে ন্যায়বিচার হবে না। শুনানিতে অংশ নিতে আমাকে বাধ্য করবেন না।প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি আদালতকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন যে আপনি নিজেই বিপদে পড়বেন।অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন? গতকাল বলেছেন যে সবাই শুনবেন। কিন্তু তা তো দেখছি না। আমরা তো আদালতকে সহযোগিতা করতে চাই।

প্রধান বিচারপতি বলেন, হাইকোর্টের রায় উপস্থাপন করতে সমস্যা কোথায়? আপনি লিখিত যুক্তিতর্ক দাখিল করুন।অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপনি বলেছিলেন যে সাতজনই শুনবেন। কিন্তু এখন তা শুনছেন না। আমি তো বলেছি মে মাসেই শুনানি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এভাবে হলে তো আমি এ মামলা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হব।প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি পীড়াপীড়ি করছেন কেন?এরপরও প্রধান বিচারপতি রায় উপস্থাপন করতে বললে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রায় উপস্থাপন করব। তবে আমাকে সময় দিতে হবে।প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা আগে বলেছিলাম লিখিত যুক্তিতর্ক প্রস্তুত করে তা দাখিল করতে। আপনার দপ্তরে ১৫৫ জন আইন কর্মকর্তা আছেন। তাই এটা প্রস্তুত করতে এত সময় লাগবে কেন।অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, দুই সপ্তাহ সময় চেয়েছি। এই সময় দিলে আকাশ ভেঙে পড়বে না। আশা করছি এ সময়ের মধ্যে ওনারা (বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন) ফিরে আসবেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি হাইকোর্টে শুনানি করেছেন। আপনার সব মনে থাকার কথা।বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, আপনি আদালতের প্রধান আইন কর্মকর্তা। তাই মামলা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা বলা ঠিক হয়নি।অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমি নিরুপায় হয়ে বলেছি। আপনারা যখন ৫ জন শুনবেন বলেছেন তখন এটা বলেছি।এরপর অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা পেপারবুক থেকে পড়া শুরু করেন। তার বক্তব্য উপস্থাপন শেষ হলে প্রধান বিচারপতি বলেন, গতকাল (সোমবার) সিনিয়র আইনজীবী টি এইচ খান উপস্থিত ছিলেন। আজ ড. কামাল হোসেন, এম আই ফারুকী আছেন।এ পর্যায়ে ড. কামাল হোসেন দাঁড়িয়ে বলেন, আমি লিখিত যুক্তিতর্ক দাখিল করেছি।এ সময় ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম ও ড. আবদুল ওয়াদুদ ভুইয়া অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে লিখিত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, আশা করি বাকি যারা আছেন তারাও দাখিল করবেন। এরপর প্রধান বিচারপতি আগামী রবিবার (১৪ এপ্রিল) পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপনারা ন্যায়বিচারের স্বার্থে অপরাপর সব মামলায় সকল পক্ষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। এ মামলায় সেটা করছেন না কেন। দুই সপ্তাহ সময় দেওয়ার আবেদন করছি।প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, এখানে বিচারকদের শৃঙ্খলার বিষয়টি জড়িত। সুপ্রিম কোর্ট এই সংবিধানের অভিভাবক। আমাদের একদিকে যেতে হবে। এরপর আদালত আগামী ২১ মে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেন।এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, করজোড়ে বলছি, সবাইকে নিয়ে শুনানি করুন।প্রধান বিচারপতি বলেন, সবাইকে নিয়ে শুনতে হবে এমন শর্ত দেওয়া যায় না। একজন বিচারপতি অসুস্থ থাকতে পারেন। একজন বিদেশে থাকতে পারেন। একজন তো জুলাইয়ে অবসরে যাবেন। কেউ জুলাই পর্যন্ত অসুস্থ থাকতে পারেন। সব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই প্রধান বিচারপতিকে আদালত চালাতে হয়।